March 11, 2026, 5:13 pm

শুভব্রত আমান/
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সেলিম তোহা সতর্ক করে বলেছেন, “যথেষ্ট সতর্কতা না নিলে বেশি আমদানি স্থানীয় ধানচাষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে গত ১৬ কর্মদিবসে ৩২টি চালানে মোট ৫,০০৫ টন সেদ্ধ চাল দেশে প্রবেশ করেছে। পরিমাণটি তুলনামূলকভাবে সীমিত হলেও বাজারের অংশগ্রহণকারীরা মনে করছেন, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়েছে এবং বাজারে দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছে।
বন্দর সূত্র জানিয়েছে, চাল আমদানির কার্যক্রম শুরু হয় ২৭ জানুয়ারি থেকে। ধাপে ধাপে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাকযোগে চাল বেনাপোল বন্দরে পৌঁছেছে। সব ৩২টি চালান বন্দরে পৌঁছে গিয়েছে, যা সরকারের আমদানির নির্ধারিত সময়সীমার আগে সম্পন্ন হয়েছে।
বেনাপোল বন্দরের পরিচালক শামীম হোসেন দৈনিক সানের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
দেশের বাজারে চালের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য নিয়ে সরকার ১৮ জানুয়ারি ২৩২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মোট ২ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। ১০ মার্চের মধ্যে এসব চাল দেশে নিয়ে এসে স্থানীয় বাজারে সরবরাহের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্বে ছিল মেসার্স হাজি মুসা করিম অ্যান্ড সন্স এবং কে বি এন্টারপ্রাইজ। চালের বেশিরভাগই মোটা সেদ্ধ জাতের, যা ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৪১টি ট্রাকে আনা হয়।
মেসার্স হাজি মুসা করিম অ্যান্ড সন্সের স্বত্বাধিকারী আবদুস সামাদ জানিয়েছেন, প্রতি কেজি চালের আমদানির খরচ প্রায় ৫০ টাকা। খোলাবাজারে এই চালের দাম হবে আনুমানিক ৫১ টাকা প্রতি কেজি।
বন্দর সূত্র আরও জানায়, গত বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বরের মধ্যে বেনাপোল দিয়ে প্রায় ৬,১২৮ টন চাল আমদানি করা হয়েছিল। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার রায়হাত হোসেন বলেন, চালের চালান যেন বন্দরে আটকে না থাকে এবং দ্রুত বাজারে পৌঁছায়, এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সরবরাহ বেড়েছে/
বেনাপোল বন্দরের মাধ্যমে সাম্প্রতিক আমদানির ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় চালের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নড়াইল, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের পাইকারি বাজার মূলত বেনাপোল বন্দর কেন্দ্রিক হওয়ায় এখানে সরবরাহ দ্রুত পৌঁছায়।
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদন কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগরের চালকল মালিকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে পাইকারি বাজারে দাম মোটামুটি স্থিতিশীল।
কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু জাফর বলেন, “কয়েক সপ্তাহ ধরে চালের বাজার স্বাভাবিক রয়েছে। নতুন ধান বাজারে আসার আগে ভারতীয় চালের সীমিত আমদানি অব্যাহত থাকলে দাম ধরে রাখা সহজ হবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের কিছু এলাকায় চালের দাম বাড়তির দিকে থাকলেও আমদানিকৃত চাল বাজারে চাপ কমাতে পারে। বিশেষ করে ভারতের তুলনামূলক কম দামের মোটা সেদ্ধ চাল নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ভোক্তাদের জন্য স্বস্তি এনে দিতে পারে।
কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনার পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, নতুন চাল আমদানির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অনেক ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মজুদ থেকে বিরত রয়েছেন। তারা মনে করেন, আমদানিকৃত চালের ধারাবাহিক সরবরাহ কৃত্রিম সংকটের সুযোগ কমাবে এবং দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক/
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের ধান উৎপাদন ভালো হলেও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি বা মজুতদারির কারণে দাম বেড়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে চাল আমদানির বাজারে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব পড়ে, যা দাম স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়।
কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সেলিম তোহা সতর্ক করে বলেছেন, “যথেষ্ট সতর্কতা না নিলে বেশি আমদানি স্থানীয় ধানচাষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে নতুন ধান বাজারে আসার সময় অতিরিক্ত আমদানির ফলে কৃষক ন্যায্য দাম পেতে নাও পারেন।”
ভারসাম্যপূর্ণ নীতি জরুরি/
নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, চাল আমদানির ক্ষেত্রে বাজার পরিস্থিতি, স্থানীয় উৎপাদন এবং কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি নেওয়া জরুরি। এতে ভোক্তা ও কৃষক—উভয়ের স্বার্থই রক্ষা করা সম্ভব হবে।